বগুড়া গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক বাবু হত্যাকান্ডের মূল ঘাতক শিবির নেতাসহ ৩ জনকে গ্রেফতার

0
411

বগুড়া প্রতিনিধিঃ বগুড়া গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও শেরপুর ডিগ্রী কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক জিয়া উদ্দিন জাকারিয়া বাবু(৪৭) হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন হয়েছে। দীর্ঘ প্রায় ৩ বছর পর এহত্যাকান্ডের মূল আসামী শিবির নেতাসহ ৩ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। শনিবার পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে এক প্রেস ব্রিফিংএ একথা জানিয়েছে পুলিশ সুপার আসাদুজ্জামান।
প্রেস ব্রিফিংএ লিখিত বক্তব্যে তিনি জানান, গত ২০১৩ সালের ৯ ডিসেম্বর অনুমান রাত্রি ৯ টায় বগুড়া শহরস্থ সেলিম হোটেলের সামনে শহরের গোকুল দক্ষিণপাড়া মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে কয়েকজন সন্ত্রাসী কর্তৃক বগুড়া গণজাগরণ মঞ্চের সংগঠক ও শেরপুর ডিগ্রী কলেজের গণিত বিভাগের প্রভাষক জিয়া উদ্দিন জাকারিয়া বাবু(৪৭) নির্মম ও নৃশংসভাবে হত্যার শিকার হন। লোমহর্ষক ও সে সময়ের বহুল আলোচিত এ হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচনে বগুড়া পুলিশ দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। এর ফলশ্রুতিতে বগুড়া গোয়েন্দা শাখার একটি শুক্রবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সন্ধ্যার পর হতে সাঁড়াশি ও ক্রমাগত অভিযান পরিচালনা করে বগুড়া শহরের চকসূত্রাপুর, সবুজবাগ ও জামিল নগর থেকে এ হত্যাকান্ডের মূল ঘাতকসহ অপরাপর সহযোগী ২ ঘাতককে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারকৃতরা হচ্ছে, সারিয়াকান্দির নারচী তরফদার পাড়ার মোঃ ইব্রাহীম ফকির এর ছেলে মাইনুর ইসলাম ফকির(২১), শিবগঞ্জ উপজেলার সাত আনা কিচক এর মোঃ মোশাররফ হোসেনের ছেলে মোঃ মহসিন আলী(২১), ও সদরের সবুজবাগ এলাকার বেলায়েত হোসেন এর ছেলে মোঃ হাবিবুল্লাহ নাঈম(১৯)।

পুলিশ আরো জানায়, পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে ঘাতক মাইনুর জানায় যে, ঘটনার দিন বিকালে তার আশ্রয় দাতা ইসলামী ছাত্র শিবিরের আজিজুল হক কলেজ শাখার তৎকালীণ শীর্ষ এক নেতা তাকে জামিলনগর মোড়ে ডেকে পাঠায়। সেখানে গিয়ে সে ইসলামী ছাত্র শিবিরের ঐ নেতাসহ আরও অনেক নেতা কর্মীকে দেখতে পায়। শিবিরের শীর্ষ স্থানীয় ২জন নেতা তাকে গণজাগরণ মঞ্চের আহবায়ক জিয়াউদ্দিন জাকারিয়া বাবুকে হত্যার পরিকল্পনার কথা জানায়। পরিকল্পনা অনুযায়ী ঐ দুই শিবির নেতা গ্রেফতারকৃত আসামী মোঃ মহসিন আলী ও আসামী মোঃ হাবিবুল্লাহ নাঈমকে ২টি হোন্ডাযোগে অগ্রগামী দল হিসেবে সাতমাথা থেকে শুরু করে থানা মোড়, সেলিম হোটেল ও আশপাশের এলাকায় পুলিশের কোন টহল দল আছে কিনা তা দেখার জন্য পাঠায়। মহসিন ও নাঈম উক্ত এলাকাগুলোতে পুলিশের উপস্থিতি নাই নিশ্চিত করলে মুল পরিকল্পনাকারী ঐ দুই শীর্ষ স্থানীয় শিবির নেতা ৪টি হোন্ডাযোগে অনুমান ৭/৮জন সহযোগী কর্মীসহ ১টি ককটেল ভর্তি ব্যাগ ও কয়েকটি ধারালো চাকু নিয়ে রাত্রি অনুমান ০৮.৪৫ টায় সেলিম হোটেলের সামনে উপস্থিত হয়। এরপর শিবিরের এক নেতা মাইনুর’কে একটি নেশা জাতীয় ট্যাবলেট খাওয়ায়ে তার হাতে ১টি ধারালো চাকু ধয়িয়ে দেয়। ইতোমধ্যে গ্রেফতারকৃত মহসিন ও নাঈম সেলিম হোটেলের সামনে পৌঁছে যায়। বাবু সেলিম হোটেলের পার্শ্বে অবস্থিত তৃপ্তি প্রেসে বসে ছিল। মহসিন বাবুর অবস্থান নিশ্চিত করার জন্য কার্ড তৈরীর নাম করে উক্ত প্রেসে প্রবেশ করে প্রেসের মালিক ও বগুড়া জেলা সেক্টরস কমান্ডার্স ফোরামের বর্তমান সভাপতি মোঃ মাছুদুর রহমান হেলাল এর সাথে কথা বলে বাবুর উপস্থিতি নিশ্চিত করে বের হয়ে আসে। এরপর শিবিরের অপর এক নেতা জিয়া উদ্দিন বাবুকে অনুসরণ করতে থাকে। অনুমান রাত্রি ৯ টার দিকে বাবু সেলিম হোটেলের পার্শ্বে অবস্থিত তৃপ্তি প্রেস থেকে বের হওয়ামাত্র তাকে অনুসরণকারী শিবির নেতা তার গালে সজোড়ে থাপ্পড় মারে এবং মাইনুরকে বলে “মার শালাকে”। ঘাতক মাইনুর সাথে সাথেই তার হাতে থাকা ধারালো চাকু দিয়ে প্রথমে পাঁজরে আঘাত করে ও পরে কানের নিচে সজোড়ে চাকু ঢুকিয়ে মোচড় মারে। বাবু মাটিতে লুটিয়ে পড়লে শিবিরের অপর নেতা কর্মীরা তাকে এলোপাথারীভাবে কুপিয়ে তার মৃত্যু নিশ্চিত করে এলাকায় আতংক সৃষ্টির জন্য ১০/১৫টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ত্রাস সৃষ্টি করে মোটরসাইকেইযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করে। এরপর জামিলনগর মোড়ে গিয়ে উক্ত নেতা মাইনুর’কে ৩ হাজার টাকা দিয়ে এক মাসের জন্য শহরের বাইরে পাঠিয়ে দেয়।
ঘটনার দুই দিন পর ভিকটিমের ছোট ভাই সামছুদ্দিন সোলায়মান সাধু বাদী হয়ে অজ্ঞাতনামা আসামীদের বিরুদ্ধে বগুড়া সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন।
উল্লেখ্য যে, মূল ঘাতক মোঃ মাইনুর ইসলাম ফকির’কে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায় যে, সে ২০০৯ ও ২০১০ সালে বগুড়া শহরের রেটিনা কোচিং সেন্টারের নাইট গার্ড হিসেবে কর্মরত ছিল। পরবর্তীতে ২০১১ সাল হতে ইসলামী ছাত্র শিবির বগুড়া আযিযুল হক কলেজ শাখার শীর্ষ স্থানীয় একজন নেতার তত্ত্বাবধানে থেকে ইসলামী ছাত্র শিবির কর্তৃক আহুত হরতাল, অবরোধ ও বিক্ষোভ মিছিলসহ দলীয় বিভিন্ন কর্মকান্ডে ককটেল, পেট্রোল বোমা ও অগ্নি সংযোগসহ যাবতীয় নাশকতামূলক কর্মকান্ডে সক্রিয়ভাবে জড়িয়ে পড়ে।
ধৃত মাইনুর ২০১৫ সালের অবরোধ চলাকালীন পেট্রোল বোমা নিক্ষেপ, গাড়ীতে অগ্নি সংযোগসহ যাবতীয় নাশকতামূলক কর্মকান্ডের মূল হোতা ছিল এবং সে বগুড়া শহরের বিভিন্ন স্থানে ৩০০/৪০০ টি ককটেল এর বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে বলে পুলিশকে জানায়।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here