তারিখ পরিবর্তন : মীর কাসেম আলীর আপিলের রায় ৮ মার্চ

0
379

জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর আপিলের ওপর আসামিপক্ষ ও রাষ্ট্রপক্ষের শুনানি শেষে আগামী ৮ মার্চ রায় ঘোষনার দিন ধার্য করা হয়েছে।
প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগ বেঞ্চ আজ এ আদেশ দেয়। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।
এর আগে প্রধান বিচারপতি আপিলের রায় ঘোষণা জন্য ২ মার্চ দিন ধার্য করেন। পরে বেলা সোয়া একটায় এ তারিখ পরিবর্তন করে ৮ মার্চ দিন ধার্য করে দেয়া হয়। তারিখ পরিবর্তনের কারণ হিসেবে সুপ্রিমকোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয় সূত্র জানায়, ওই দিন (২ মার্চ) সিলেটে প্রধান বিচারপতির একটি অনুষ্ঠান থাকায় রায়ের তারিখ পরিবর্তন করে পরবর্তী তারিখ ৮ মার্চ ধার্য করা হয়েছে। ডেপুটি এটর্নি জেনারেল খন্দকার দিলিরুজ্জামান সাংবাদিকদের জানান, আদালত প্রথমে রায়ের জন্য ২ মার্চ দিন রাখলেও পরে উভয় পক্ষের উপস্থিতিতে তা পরিবর্তন করে ৮ মার্চ ঠিক করে দেয়।
এর আগে আজ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে যে রায় দিয়েছে তা বহাল রাখার আর্জি জানিয়ে বক্তব্য পেশ করেছে রাষ্ট্রপক্ষে এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। খালাসের আর্জি জানিয়ে আসামিপক্ষে শুনানিতে অংশ নিয়েছেন সিনিয়র আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন ও এস এম শাহজাহান।
গত ৯ ফেব্রুয়ারি থেকে মীর কাসেমের আপিল মামলাটির শুনানি শুরু হয়। আপিল বিভাগের এক নম্বর বিচার কক্ষে ৭ কার্যদিবসে এ মামলার শুনানি আজ শেষ হলো। এটি আপিলে সপ্তম মামলা যার চুড়ান্ত শুনানি শেষে রায় ঘোষণার দিন ধার্য হয়েছে।
সুপ্রিমকোর্টের আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় মীর কাশেম আলীর পক্ষে এডভোকেট অন রেকর্ড জয়নুল আবেদীন তুহিন ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর এ আপিল দায়ের করেন। আইনজীবী শিশির মোহাম্মদ মনির জানান, মীর কাশেম আলীর পক্ষে ১৮১টি গ্রাউন্ডে মৃত্যুদন্ড থেকে খালাস চেয়ে এ আপিল করা হয়। দেড়শ’ পৃষ্ঠার মূল আপিলসহ ৫ ভলিয়মে ১ হাজার ৭৫০ পৃষ্ঠায় বিভিন্ন ডকুমেন্টও পেশ করা হয়।
আনীত অভিযোগ প্রমানিত হওয়ায় ২০১৪ সালের ২ নভেম্বর মীর কাশেম আলীকে মৃত্যুদন্ড দিয়ে রায় ঘোষণা করে ট্রাইব্যুনাল। মামলায় মীর কাসেমের বিরুদ্ধে ১৪টি অভিযোগ আনা হয়। রায়ে বলা হয়, প্রসিকিউশন আনীত ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ২, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯, ১০, ১১, ১২ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলী দোষী প্রমাণিত হয়েছে। তবে ১, ৫, ৮ ও ১৩ নম্বর অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাকে এসব অভিযোগ থেকে খালাস (অব্যাহতি) দেয়া হয়।
প্রমাণিত অভিযোগগুলোর মধ্যে ২ নম্বর অভিযোগে তাকে ২০ বছরের কারাদন্ড দেয়া। ৩, ৪, ৬, ৭, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে তাকে ৭ বছর করে মোট ৪২ বছর কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। এছাড়াও ১৪ নম্বর অভিযোগ ১০ বছরের কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। এই ৮টি অভিযোগে তাকে সর্বমোট ৭২ বছর কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়েছে। ১১ নম্বর অভিযোগে রয়েছে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিমসহ ছয়জনকে আটক, নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ। এ অভিযোগে বিচারকরা সর্বসম্মতিক্রমে মীর কাসেমকে মৃত্যুদন্ডের আদেশ দেয়। ১২ নম্বর অভিযোগে রয়েছে রঞ্জিত দাস ও টুন্টু সেনকে নির্যাতন ও হত্যার অভিযোগ। এ অভিযোগে বিচারকদের মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে রায় দেয়া হয়। ১১ ও ১২ নং অভিযোগ ছাড়া বাকি ১২টি অভিযোগই অপহরণের পর আটকে রেখে নির্যাতনের অভিযোগ মীর কাসেমের বিরুদ্ধে।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতায় ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের নিয়ে গঠিত সশস্ত্র আলবদর বাহিনীর চট্রগ্রাম অঞ্চলের কমান্ডার হিসেবে মীর কাসেম আলী মানবতাবিরোধী অপরাধ ঘটান, তা রায়ে প্রমাণিত হয়।
ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিমের অন্যতম সদস্য রানা দাস গুপ্ত বাসস’কে বলেন, মীর কাশেম মুক্তিযুদ্ধের সময় চট্রগ্রাাম কলেজের ছাত্র ছিলেন। তিনি ওই সময় চট্রগ্রাম কলেজ শাখা ইসলামী ছাত্রসংঘের সভাপতি, চট্রগ্রাম শহর শাখারও সভাপতি ছিলেন। পরবর্তীতে ৭১’ এর ৬ নভেম্বর পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের প্রাদেশিক কার্যকরী পরিষদের সদস্য এবং পূর্ব পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের সাধারণ সম্পাদক পদেও অধিষ্ঠিত হন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে মীর কাশেম আলী ইসলামী ছাত্রসংঘের বাছাই করা সদস্যদের সমন্বয়ে সশস্ত্র আলবদর বাহিনী গঠন করেন। সেই আলবদর বাহিনীর কমান্ডার হিসেবে মীর কাশেম আলী চট্রগ্রাম অঞ্চলে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেন। রানা দাস গুপ্ত বলেন, চট্রগ্রাম শহরের চামড়ার গুদাম, সালমা মঞ্জিল, ডালিম হোটেলসহ শহরের বিভিন্ন স্থানে মীর কাশেম আলী তার সহযোগীদের নিয়ে আলবদর বাহিনীর নির্যাতন কেন্দ্র গড়ে তোলেন। এসব নির্যাতন কেন্দ্রগুলোতে মানুষকে ধরে নিয়ে দিনের পর দিন নির্যাতন এবং হত্যাকান্ড ঘটানো হয়। যা সাক্ষ্য প্রমানের ভিত্তিতে মামলায় প্রমাণ করতে সক্ষম হয় প্রসিকিউশন।
মামলায় মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা (আইও) নুরুল ইসলামসহ প্রসিকিউশনের পক্ষে ২৪ জন ট্রাইব্যুনালে সাক্ষী সাক্ষ্য দেয়। এরপর মীর কাসেম আলীর পক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেয় তার ছোট বোন মমতাজ নুরুদ্দিনসহ তিনজন। মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় ট্রাইব্যুনালের আদেশে ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাশেম আলীকে গ্রেফতার করা হয়। সে থেকে তিনি কারাগারে রয়েছেন।
এর আগে ঢাকা গত ৬জানুয়ারি জামায়াতের আমীর মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে আনা আপিলের রায় ঘোষনা করা হয়েছে। এ মামলা এখন পূর্নাঙ্গ রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। এটি আপিলের ষষ্ঠ রায়। এছাড়াও আপিলে চুড়ান্ত পাঁচটি রায়ের পর চারটিতে জামায়াতের দুই সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লা ও মুহাম্মদ কামারুজ্জামান, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন কাদের (সাকা) চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়েছে। আপিলের আরেক রায়ে জামায়াতের নায়েবে আমীর দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর সাজা কমিয়ে আমৃত্যু কারাদন্ড দেয়া হয়েছে। এ রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়। রায় রিভিউ চেয়ে রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষ ইতোমধ্যে আবেদন দাখিল করেছে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here