প্লাস্টিক স্বাস্থ্যের জন্য বিপদজনক

0
2966

খন্দকার তাজউদ্দিন:
প্লাস্টিক বর্জ্যে পরিবেশ দূষণ হচ্ছেই। এটা কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। আমাদের দেশে এত বেশি পরিমাণে প্লাস্টিকের রিসাইকেল করা হচ্ছে যে তার মাধ্যমে সৃষ্ট দুষণও চিন্তার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখানে প্লাস্টিক একবার কি দু’বার নয়, অনেক সময় চারবার পর্যন্ত পুনর্ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে দুষণের মাত্রাও সেই অনুপাতে ছড়াচ্ছে। এটি আরো বিপজ্জনক কারণ পুনর্ব্যবহার প্রক্রিয়ার অধিকাংশই সম্পন্ন হচ্ছে সারাদেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট কারখানাগুলোর মাধ্যমে। যাদের পরিবেশকে দুষণমুক্ত রাখার কারিগরি ও আর্থিক ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। আমাদের দেশে খাবার ও অন্যান্য পণ্যের প্যাকেট থেকে শুরু করে সর্বত্র পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ব্যবহারের মূল কারণ সচেতনতার অভাব ও যথাযথ আইন না থাকা। এছাড়া দারিদ্রতাও আরেকটি কারণ।

প্লাস্টিক বর্জ্য দ্রব্যের পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়াটি বিপজ্জনক। এসব প্রক্রিয়ায় অনেক সময় ডাই-অক্সিন বা ফিউরেনের মতো বিষাক্ত বাষ্প নির্গত হয়, যা মানুষের শরীরের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকর। যেসব প্লাস্টিক বিশেষভাবে বিপজ্জনক বস্তু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, তার মধ্যে অন্যতম পলিভিনাইল ক্লোরাইড (পিভিসি)। অথচ এদেশে পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকের ৪৫ শতাংশই পিভিসি। পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিকে পিভিসির জনপ্রিয়তার মূল কারণ কিন্তু অর্থনৈতিক। দেশে যত পিভিসি চপ্পল বিক্রি হয় তার ৮০ শতাংশ তৈরি হয় পুনর্ব্যবহারের প্লাস্টিক থেকে। পিভিসির পরেই পুনর্ব্যবহারের তালিকায় শীর্ষস্থান এলডিপিই। যার পুনর্ব্যবহারের হার ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশে যত প্লাস্টিক ব্যাগ ব্যবহার হয় মুদির দোকানে ও বাজারে ক্যারিব্যাগ হিসেবে তার ৫০ শতাংশই পুনর্ব্যবহৃত প্লাস্টিক থেকে তৈরি। এখানেও সস্তা দাম এই ব্যাগের জনপ্রিয়তার মূল কারণ। পাশাপাশি ব্যবহারের সুবিধা তো আছেই।

এসব তথ্য থেকে এটাই স্পষ্ট হয় যে, পরিবেশ সংক্রান্ত কোনো বিষয়কে দেশে সামগ্রিক অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক অবস্থা থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেখা যায় না। এ ব্যাপারে পরিবেশ সচেতন মানুষ সোচ্চার হয়েও কিছুই করতে পারছে না। পশ্চিমা পরিবেশপ্রেমী সংগঠনগুলো তথ্যের ভিত্তিতে এদেশে পরিবেশ সংক্রান্ত বিভিন্ন বিধি-নিষেধের দাবি তুলেও কোন ফল আনতে পারছে না। দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় এসব দাবি কার্যকর হচ্ছে না।

টেকনিক্যাল জার্নালে পিভিসির গুণের কথা লেখা হলেও গণবিজ্ঞানের পত্র-পত্রিকাগুলোতে পিভিসির ভাবমূর্তি খুবই মলিন। অথচ সরকারের এক সমীক্ষায় দেখা যাচ্ছে কৃষি কাজে ব্যবহৃত বৈদ্যুতিক বা ডিজেলচালিত পাম্প সেটের ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ জিআই পাইপের বদলে পিভিসি পাইপ ব্যবহার করলে ১৫ শতাংশ শক্তির সাশ্রয় সম্ভব। এর সঙ্গে মাঠে পানি সরবরাহের জন্যও যদি পিভিসি পাইপ ব্যবহার করা হয়, তাহলে আরো ৫ শতাংশ শক্তি সাশ্রয় সম্ভব। এখন এই শক্তি সাশ্রয় মানেই পরিবেশেকে দুষণমুক্ত রাখতে সাহায্য করা। সারাদেশে কৃষিকাজে যে হাজার হাজার পাম্পসেট ব্যবহার হয়, তা বিবেচনা করলে জিআই পাইপের বদলে পিভিসি পাইপের ব্যবহার পরিবেশের জন্য ইতিবাচক হবে। শক্তি সাশ্রয় ও পরিবেশের মধ্যে ইতিবাচক সম্পর্ককে মেনে নিলে প্লাস্টিক দ্রব্য উৎপাদনে এই বিপুল শক্তির সাশ্রয়ই একে এত স্বল্প মূল্যে বাজারজাত করতে সাহায্য করছে। ফলে বিভিন্ন দ্রব্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে চলে আসার পাশাপাশি আমাদের অজান্তে উৎপাদন প্রক্রিয়ার অন্তত একটি অংশে পরিবেশের দুষণও হ্রাস পাচ্ছে। তবে একথা মোটেও বলা যায় না যে, প্লাস্টিক সব ক্ষেত্রে দুষণের মাত্রা কমাতে সাহায্য করছে। এরজন্য প্রয়োজন বিভিন্ন উপকরণের পুরো উৎপাদন প্রক্রিয়ার মধ্যে একটি তুলনামূলক সমীক্ষা। শুধু উৎপাদন প্রক্রিয়া নয়, বর্জ্য পদার্থ হিসেবে এটি পরিবেশের ক্ষতি করছে উপকরণের ব্যবহারিক, শারীরিক পর্যায়ে ব্যবহারকারী শারীরিক ক্ষতির তুলনামূলক সমীক্ষাও ক্ষতির মাত্রা ধরা পড়ে। কোনো বিশেষ পদার্থ ব্যবহারের ক্ষেত্রে বিধি-নিষেধের কথা এই ধরনের সমীক্ষার পরই চিন্তা করা উচিত। যা হবে সঠিক ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিচায়ক।

প্রত্যেক দেশের সরকারকে তার নাগরিকদের কথা মাথায় রেখে কতকগুলো ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করতে হয়। এর মধ্যে পরিবেশ ও স্বাস্থ্য সংক্রান্ত বিষয়গুলো বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে প্রতি বছর প্লাস্টিকের ব্যবহার দ্রুত হারে বাড়ছে। অথচ দেশে প্লাস্টিকের ব্যবহার ও পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করে তুলতে কারখানার শ্রমিকদের স্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে, তেমনি খাদ্যজাত করার অনুপযোগী প্লাস্টিক মোড়ক হিসেবে নাগরিকদের শারীরিক ক্ষতিও হচ্ছে। এই বাস্তবতায় সরকারের কতগুলো পদক্ষেপ নেয়া জরুরি হয়ে পড়েছে। যার মধ্যে অন্যতম হচ্ছে প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালার ঘোষণা ও সেই নীতিমালাকে বাস্তবে রূপায়িত করতে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা। এছাড়া প্লাস্টিক শিল্পে নিযুক্ত শ্রমিকদের স্বার্থে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত নির্দেশাবলি জারি করা। নাগরিক সার্বিক স্বার্থে শহরাঞ্চলে জঞ্জাল অপসারণ সংক্রান্ত নীতি প্রণয়ন করা। এক্ষেত্রে নাগরিকদের স্বাস্থ্য ও দেশের পরিবেশকে রক্ষার জন্য এসব ব্যবস্থা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গে, সরকারকে নতুন আইন ও নির্দেশাবলির সঠিক প্রয়োগের দিকে নজর দিতে হবে। এসব আইনের যাতে সঠিক প্রয়োগ হয়, সেজন্য গণসংগঠন, ট্রেড ইউনিয়ন ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ আমাদের সবারই অভিজ্ঞতা রয়েছে, আইন থাকলেও কারখানার মালিকরা আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে পরিবেশকে দূষিত করে চলেছে। দুষণ সংক্রান্ত নতুন আইন প্রণয়ন ছাড়া আরো কতগুলো পদক্ষেপের কথা ভাবা যেতে পারে। যেমন পরিবেশ সংক্রান্ত অডিট ও প্রয়োজনবোধে পরিবেশ সংক্রান্ত লেভি বা কর। পরিবেশ সংক্রান্ত লেভি বা কর দুটি উদ্দেশ্যে আরোপ করা যেতে পারে। প্রথমত, কোনো বিশেষ শিল্প যদি পরিবেশে বিশেষ ধরনের সমস্যার সৃষ্টি করে, যা নিয়ন্ত্রণ করতে সরকারকে আলাদা ব্যবস্থা নিতে হয়, তাহলে সরকারের ব্যয়ের একটি অংশ এই করের মধ্য দিয়ে তুলে নেয়া যায়। দ্বিতীয়ত, দুষণমুক্ত প্রযুক্তি উদ্ভাবনের গবেষণায় ব্যয় করার জন্যও লেভি বা কর বসানো যেতে পারে। বাংলাদেশে প্লাস্টিকের পুনর্ব্যবহারের প্রক্রিয়াকে দুষণমুক্ত করে গড়ে তোলার জন্য নতুন প্রযুক্তি গ্রহণ জরুরি। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট ছোট কারখানার পক্ষে এককভাবে এসব পদক্ষেপ গ্রহণ অনেক ক্ষেত্রেই করা সম্ভব নয়। সরকার প্লাস্টিকজাত পণ্যের ওপর সামান্য কিছু লেভি বা কর আরোপ করে হয়তো এই সমস্যার সমাধান করতে পারে।

পলিথিনের প্রত্যাবর্তন
পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগ আবার ফিরে এসেছে। ঢাকাসহ সারাদেশে প্রকাশ্যে এখন এর ব্যবহার চলছে। ডিপার্টমেন্টাল চেইনশপ থেকে শুরু করে কাঁচাবাজারে মাছ-মাংস, শাক-সবজি সবকিছুই দেওয়া হচ্ছে পলিব্যাগে। আইনের কার্যকর প্রয়োগ না থাকায় দেদারছে চলছে নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন, বাজারজাত, বিক্রি ও ব্যবহার। আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নাকের ডগায় প্রকাশ্যেই চলছে নিষিদ্ধ পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন। বাজারজাত ও ব্যবহারের কাজটিও চলছে সবার চোখের সামনেই। এদিকে পলিথিনের ব্যবহার বন্ধে সরকার পণ্যের মোড়ক হিসেবে পাটের ব্যাগ ব্যবহার নিশ্চিত করতে আইন করলেও তা কার্যকর হচ্ছে না। কঠোর আইন থাকলেও আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর দুর্নীতি ও অবহেলার কারণে বন্ধ হচ্ছে না নিষিদ্ধ পলিথিনের উৎপাদন ও ব্যবহার। ২০০২ সালের ১ জানুয়ারি থেকে রাজধানীতে এবং পরে ১ মার্চ থেকে সারাদেশে পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। এ জন্য পরিবেশ আইন ১৯৯৫ সংসদে সংশোধনও করা হয়।
২০০২ সালের সংশোধিত নতুন আইনে বলা হয়, আইন অমান্য করে পলিথিন উৎপাদন করলে ১০ বছরের সশ্রম কারাদ- ও ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা করা হবে। পলিথিন বাজারজাত করা হলে ছয় মাসের জেল ও জরিমানা করা হবে ১০ হাজার টাকা। প্রথম দিকে সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ক্রেতারা পাট ও কাগজের ব্যাগ ব্যবহার শুরু করলেও তদারকির অভাবে বর্তমানে এ উদ্যোগ ভেস্তে গেছে।
পরিবেশ অধিদফতরের মতে, দেশের সিংহভাগ নাগরিক পলিথিন শপিং ব্যাগের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে সচেতন। ৯০ ভাগেরও বেশি নাগরিক এর উৎপাদন বন্ধের পক্ষে হলেও সহজলভ্য হওয়ায় তারাও এর ব্যবহার করেন। এছাড়া স্বল্পমূল্য, স্থায়িত্ব এবং পানিরোধক সুবিধাও পলিথিন ব্যাগ ব্যবহারের অন্যতম কারণ। বিশেষজ্ঞদের মতে, অবৈধ উৎপাদন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা, পলিথিনের বিকল্প পাট, কাপড় ও কাগজের ব্যাগ সহজলভ্য ও সুলভ মূল্য না হওয়া এবং বিকল্প ব্যাগ ব্যবহারে মানুষের অনভ্যস্থতায় পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ হয়নি। সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকা শহরের একটি পরিবার প্রতিদিন গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার শেষে ফেলে দেওয়া হয়।
পুরান ঢাকার ইসলামবাগ ও চকবাজার এলাকায় গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি পলিথিন কারখানা। সরজমিনে দেখা গেছে, বেশিরভাগ কারখানার মূল দরজায় তালা লাগিয়ে ভেতরে পলিথিন উৎপাদন চলছে। এক কারখানা মালিক বলেন, প্রতি সপ্তাহে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও পরিবেশ অধিদফতরের সংশ্লিষ্টদের মোটা অঙ্কের ঘুষ দিয়ে তারা এ ব্যবসা চালাচ্ছেন। ভারত থেকে চোরাই পথেও পলিথিন আসছে।
শুধু পলিথিন ব্যাগই নয়, পুরান ঢাকার অনেক এলাকাতেই এর কাঁচামালও সহজলভ্য। সেখানে প্রতিদিন বিক্রি হচ্ছে লাখ লাখ টাকার কাঁচামাল পিপি, পিই ও এইচডিপিই। অনেক দোকানে এসবের মজুদও আছে পর্যাপ্ত পরিমাণে। ব্যবসায়ীরা জানান, কর্তৃপক্ষ ও কাস্টমকে ‘ম্যানেজ করে’ খুব সহজেই কাঁচামাল আমদানি করা হয়। ইসলামবাগ এলাকার ব্যবসায়ী হাজি আজমত আলী জানান, পুরাতন পলিথিন গলিয়ে কাঁচামাল তৈরি করা হয়। পরিবেশ অধিদফতরের ভুয়া সনদ নিয়ে অনেক কারখানা পলিথিন উৎপাদন করছে। লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, হাজারীবাগ এলাকা ঘুরে তার এ বক্তব্যের সত্যতা পাওয়া যায়। এছাড়া পুরান ঢাকার কামালবাগ, ইসলামবাগ, শহীদনগর, হাজারীবাগ ও দেবীদাস ঘাট এলাকার বাসা-বাড়িতেও দেদারছে তৈরি হচ্ছে পলিথিন। বিক্রি হচ্ছে পুরান ঢাকার ইমামগঞ্জ, আরমানীটোলা, চানখারপুল ও সোয়ারীঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে। সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ইমামগঞ্জ এলাকায়।
পরিবেশ অধিদফতর রাজধানীর বিভিন্ন বাজারে প্রায়ই পলিব্যাগ নিয়ন্ত্রণে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করলেও কখনও আইনের সর্বোচ্চ শাস্তি প্রয়োগ হয়নি। আদালত বিভিন্ন সময় এসব দোকানে গিয়ে সতর্ক করে দেওয়ার জন্য মাত্র ৫০০ টাকা জরিমানা করেন।
জানা গেছে, রাজধানীতে উৎপাদিত পলিথিন ব্যাগ বুড়িগঙ্গা নদী দিয়ে এবং সোয়ারীঘাট ও ইমামগঞ্জ এলাকার ট্রান্সপোর্ট এজেন্সিগুলোর মাধ্যমে সড়ক পথে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। জানা গেছে, পাইকারি হারে পলিব্যাগ কিনে তা রাজধানীর বাইরে পাঠানোর সময় থানা-পুলিশ সংশ্লিষ্ট পাইকারকে বিশেষ টোকেন দিয়ে থাকে। টোকেন ছাড়া পলিথিন পরিবহন করলে বিভিন্ন চেকপোস্টে পুলিশকে বিপুল পরিমাণ ঘুষ দিতে হয়।

পলিথিন বিপন্ন করেছেন পরিবেশ
সচেতনতার অভাব ও অজ্ঞতার কারণে মানুষ সৃষ্ট পরিবেশ দেশে দুষণ বাড়ছে আশংকাজনক হারে। পরিবেশ দুষণে মানব সৃষ্ট কারণগুলোর মধ্যে পলিথিনের ভূমিকা এখন ভয়াবহ পর্যায়ে চলে গেছে। প্রতিনিয়তই এই উপকরণটি বিপন্ন করছে আমাদের পরিবেশকে।
পলিথিনের ক্ষতিকর দিকগুলো সম্পর্কে অধিকাংশ মানুষই জানেনা। পলিথিন ব্যাগ সস্তা, দীর্ঘস্থায়ী ও সহজলভ্য হবার কারণে এর ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে ব্যাপকভাবে। ফলে এর দ্বারা দুর্ভোগের শিকার এখন আমাদের চারপাশের পরিবেশ ও প্রতিবেশ।
শুরুতে সঠিক উদ্যোগের অভাব, সচেতনা সৃষ্টি ও ক্ষতিকর দিকগুলো প্রচার না পাওয়ায় পলিথিনের ব্যবহার উৎসাহিত হয়। বাজারের থলি হাতে নিয়ে কেনাকাটা করতে যাওয়ার চিরায়ত অভ্যাসকে পাল্টে দিয়েছে এই পলিথিন। শুধু নগর, মহানগর, শহর-বন্দর নয় পলিথিন দুষণের ভয়াবহতা আজ ছড়িয়ে পড়েছে গ্রাম-গঞ্জেও। এখানে সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া পলিথিন আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশকে প্রতিনিয়ত ঠেলে দিচ্ছে বিপদজনক পর্যায়ে।
পলিথিনের কারণে ইতিমধ্যে ড্রেনেজ ব্যবস্থা অকেজো হয়ে পড়েছে। যেকোন ড্রেন বা সুয়ারেজ লাইনের দিকে তাকালেই দেখা যাবে, তা পলিথিনের দখলে। নর্দমা, খাল-বিল, পুকুর, জলাশয়, খেলারমাঠ, দালান-কোঠার আনাচে কানাচে থেকে শুরু করে সব জায়গাতেই আজ আমাদের ব্যবহৃত পলিথিন যত্রতত্র পড়ে আছে। এভাবে পলিথিন আমাদের চারদিকের পরিবেশকে যেন গ্রাস করছে।
সর্বপ্রথম ১৯৮২ সনে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার শুরু হয়। সস্তা ও সহজলভ্যতার কারণেই এটি দ্রুত বিস্তৃতি পায়। এক সমীক্ষায় জানা গেছে শুধু ঢাকা শহরেই প্রতিদিন প্রায় ৬০ লক্ষ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহৃত হয়। ব্যবহৃত পলিথিনের শতকরা ৮০ ভাগই এখানে সেখানে ফেলা হয়। এর মধ্যে মাত্র ২০ ভাগ অপসারণ করা সম্ভব হয়।
পলিথিন পরিবেশের এমন এক শত্রু যার কোন ধ্বংস নেই, বিনাশ নেই। পুড়িয়েও একে বিনাশ করা যায় না। পলিথিন পোড়ালে সৃষ্ট গ্যাস হতে কার্বন মনো-অক্সাইড, কাবর্ন-ডাই-অক্স্্াইডসহ অন্যান্য গ্যাস বায়ু দূষণ ঘটায় এবং তা স্বাস্থ্যের জন্য তা খুবই ক্ষতিকর। এজন্য আমাদের পলিথিন বর্জন ছাড়া আর কোন উপায় নেই।

পলিথিন তৈরীর ইথিলিন, পলিকার্বনেট, পলি প্রোপাইলিন ইত্যাদি রাসায়নিক যৌগ বা পলিমারের অনুগুলো পরস্পর এতো সুক্ষ্ম ও শক্তভাবে থাকে যে, সেখানে কোন অনুজীব যেমন-ব্যাকটেরিয়া, ছত্রাক প্রবেশ করতে পারে না। ব্যাকটেরিয়া ময়লা, আর্বজনা পঁচিয়ে ও খেয়ে পরিবেশ রক্ষায় সহায়তা করে। অথচ ব্যাকটেরিয়া পলিথিন নষ্ট করতে পারে না বলে এর মরণ নেই। মাটির নিচে বা উপরে অথবা পানিতে সর্বত্রই এটা পচনহীন অবস্থায় শত শত বছর টিকে থাকে। পানিতে অদ্রবনীয় এবং পানিও এর ভেতর দিয়ে চলাচল করতে পারে না। এজন্য যেখানেই পলিথিন সেখানেই বাধা সৃষ্টি হয়।
ফলে ড্রেন ও সুয়ারেজ ব্যবস্থায় বিপর্যয় সৃষ্টি করছে পলিথিন। সারা দেশেই ড্রেনেজ ব্যবস্থাকে চালু রাখতে ও পরিবেশকে রক্ষায় পলিথিন বর্জনের বিকল্প নেই। কারণ ব্যবহৃত পলিথিন যত্রতত্র ফেলে দেয়া হয় এবং নানাভাবে এসব জায়গায় এসে এগুলো জমা হয়। পলিথিনে বন্ধ হয়ে যাওয়া সুয়ারেজ লাইন বা ড্রেন, পরিবেশের যে ভয়াবহতা ক্ষতি করছে তা লিখে প্রকাশের প্রয়োজন নেই। এর ফলে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় নর্দমা, নিচু জায়গা, ড্রেন গুলোর পানি নিষ্কাশন বন্ধ হয়ে পানি বিষাক্ত হয়ে যায়। আর জলাশয় পরিণত হয় মশা, মাছির প্রজনন কেন্দ্র। নানা ধরনের জীবাণুর বাহক, রোগ-শোক বৃদ্ধি পায়। এসব রোগের বাহক মশাও বেড়ে যায়।
চিকিৎসা বিশেষজ্ঞগণও দীর্ঘদিন পলিথিন ব্যবহারে চর্ম রোগ, ক্যান্সারসহ অন্যান্য স্বাস্থ্যগত সমস্যার আশংকার কথা বলেছেন। এছাড়া পলিথিন মাটির জন্যও ক্ষতিকর। শুধু খাদ্য উৎপাদন, গবাদিপশুর রক্ষা ও পানির সুরক্ষার জন্য মাটি দুষণ রোধ করা জরুরি। আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ইরি) মতে, পলিথিন মাটির উর্বরতা হ্রাস করে। পলিথিনের কারণে মাটির অনুজীবগুলোর জন্য বেঁচে থাকার প্রতিকূল পরিবেশ সৃষ্টি হয়। ফলে অনুজীবের শারীরবৃত্তীয় কার্যকলাপ ব্যাহত হয়ে সেগুলো মারা যায়। এতে করে মাটির গঠন পরিবর্তন হয়ে যায়। স্তরে স্তরে জমা হয়ে যাওয়া পলিথিন বহুতল ভবন নিমার্ণের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
দৈনিক ব্যবহার হচ্ছে এক কোটি ২২ লাখ পিস ব্যাগ
২০০২ সালের ১ জানুয়ারি ঢাকা ও ১ মার্চ সারাদেশে পরিবেশ রক্ষায় পলিথিনের তৈরি ব্যাগ ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। কিন্তু প্রথমদিকে সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে ক্রেতারা পাট ও কাগজের ব্যাগ ব্যবহার শুরু করলেও তদারকির অভাবে বর্তমানে এ উদ্যোগ ভেস্তে গেছে। বর্তমানে অন্যায়ভাবে ব্যবহৃত পলিথিনের জটলায় আটকে আছে দেশের দম। নালা-খন্দ থেকে শুরু করে বুড়িগঙ্গার মতো ঐতিহাসিক নদীরও নিস্তার নেই এর থেকে। বিভিন্নভাবে এই পলিথিন যাচ্ছে মাটির তলায়, জলের শরীরে। ঢাকা শহরের পয়ঃনিষ্কাশনের ৮০ ভাগ ড্রেন পলিথিন ব্যাগ কর্তৃক জমাট বেধে আছে। যার ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই রাজধানীতে দেখা দেয় অসহনীয় জলাবদ্ধতা।
নিষিদ্ধ পলিথিনের ব্যবহার দিন দিন কমার কথা থাকলেও এর ব্যবহার বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। খুচরা এবং পাইকারি বাজার ও শপিংমলসহ সর্বত্রই ব্যবহৃত হচ্ছে নিষিদ্ধ পলিথিন। পরিবেশবিদ ও স্বাস্থ্যবিদসহ সচেতন মহল পলিথিনের ব্যবহার বৃদ্ধিতে শঙ্কিত। আইনগতভাবে এর ব্যবহার নিষিদ্ধ হলেও জনসচেতনতার অভাবে রাজধানীসহ সারাদেশে এর মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার পরিবেশকে বিপর্যস্ত করে তুলছে। অবৈধ উৎপাদন, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব, দুর্বল মনিটরিং ব্যবস্থা, পলিথিনের বিকল্প ব্যাগ ব্যবহারে মানুষের অনভ্যস্থতায় পলিথিনের যথেচ্ছ ব্যবহার বন্ধ হয়নি বলেও মনে করেন পরিবেশবিদরা।
এমনকি প্রশাসনিক কর্মকর্তারাও ডাল-ভাতের মত ব্যবহার করে যাচ্ছেন এই পরিবেশ ধ্বংসকারী নিষিদ্ধ পলিথিন। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি তাদের মধ্যেও যেন সচেতনতার অভাব দেখা যাচ্ছে। এভাবে পলিথিনের ব্যবহার বাড়তে থাকলে পরিবেশের মহাবিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে বলেও ধারণা পরিবেশবাদীদের।
শহর হোক বা গ্রাম যে কোনো ধরনের পণ্য কিনতে গেলেই দেখা যায় এই পরিবেশ বিধ্বংসী পলিথিনের ব্যবহার চলছে দেদারছে। সব জায়গাতেই ক্রেতারা বাজার করতে যায় খালি হাতে। কিছু চেইন শপ আর হাতে গোনা দু-একটি প্রতিষ্ঠান বাদ দিলে বাকি সব দোকানেই থাকে পলিব্যাগ। সব পণ্য সেই ব্যাগে ভরে ধরিয়ে দেয়া হয় ক্রেতার হাতে। ক্রেতাও অবলীলায় তা নিয়ে বাড়ি আসেন। পরে এই ব্যবহৃত ব্যাগ ফেলে দেয়া দেয়া হয় যত্রতত্র। সেখান থেকেই শুরু পরিবেশের সর্বনাশ। ক্রেতা বা বিক্রেতা, কারো মধ্যেই পলিথিনের ক্ষতি সম্পর্কে সচেতনতা নেই। তাদের সচেতন করতে কোনো উদ্যোগও নেই। আইন থাকলেও নেই প্রয়োগ। বাজারে পাটের ব্যাগ পাওয়া যায়, তবে সেগুলো কেনা বা ব্যবহারের তাগিদ নেই ক্রেতাদের। কোনোভাবেই নিয়ন্ত্রণহীন এ পলিথিন ব্যবহার ঠেকানো যাচ্ছে না।
বাজারে এখন টিস্যু পলিথিনের ব্যবহার চলছে হরদম। সকল সেক্টরেই যা জনপ্রিয়তাও লাভ করেছে, এর আকর্ষণীয় বাহ্যিক দিকে কারণে। কাপড়ের দোকান থেকে শুরু করে ইলেকট্রনিক্স পণ্য কেনার পর এখন বিক্রেতারা টিস্যু পলিথিনেই দ্রব্য সরবরাহ করেন। আর যাকে বলা হচ্ছে ‘মুখোশধারী পলিথিন’। কেননা, এতেও ব্যবহার হচ্ছে ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ। কিন্তু এ নিয়ে সরকারে কিংবা যথাযথ কর্তৃপক্ষের কোনো মাথাব্যাথা নেই।
এই টিস্যু পলিথিন আবার বেআইনিভাবেই উৎপাদন হচ্ছে। নেওয়া হয়নি পরিবেশ অধিদফতরের ছাড়পত্রও। সরকার একদিকে পাটজাত পণ্যের ব্যবহারের উৎসাহ দিচ্ছে আবার বেআইনি টিস্যু পলিথিন উৎপাদনে সুযোগ দিয়ে ব্যবসায়ীদেরও উৎসাহিত করছে। কেননা, এই মুখোশধারী পলিথিন উৎপাদন, বিপনন ও সরবরাহকারীদের বিরুদ্ধে সরকারের কোনো অবস্থান বা পদক্ষেপ নেই।
২০০২ সালের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, ঢাকা শহরে প্রতিদিন একটি পরিবার গড়ে চারটি পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করত। পরিবেশ অধিদফতরের মতে, ১৯৯৩ সালে বাংলাদেশে প্রতিদিন ৪৫ লাখ এবং ২০০০ সালে ৯৩ লাখ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করা হতো। কিন্তু ব্যবসায়ীদের সূত্র মতে চলতি সময়ে বাংলাদেশে প্রতিদিন ১ কোটি ২২ লাখ পলিথিন ব্যবহার হচ্ছে।
জানা যায়, চকবাজারে এইচডিপি পলিথিন প্রতি পাউন্ডের দাম পড়ে ৫৫-৬০ টাকা। এর চেয়ে উন্নতমানের পলিথিন বিক্রি হয় প্রতি পাউন্ড ৭০-৮০ টাকায়। চকবাজারের পাইকারি পলিথিন ব্যাগের দোকানগুলো সারাদেশের খুচরা ও পাইকারি ক্রেতাদের কাছে পলিথিন ব্যাগ সরবরাহ করে। বাংলাদেশ পলিপ্রোপাইল প্লাস্টিক রোল এন্ড প্যাকেজিং এসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে সারাদেশে এক হাজার পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনকারী ছোট-বড় কারখানা রয়েছে। এর মধ্যে সাতশ’টি কারখানা ঢাকাসহ পুরান ঢাকার কোতোয়ালি, চকবাজার, সূত্রাপুর, মিরপুর, কারওয়ান বাজার, তেজগাঁও, কামরাঙ্গীরচর ও টঙ্গীতে প্রচুর ছোট-বড় পলিথিনের কারখানা রয়েছে। বাকিগুলো ঢাকার বাইরে অবস্থিত।

আইন আছে বাস্তবায়ন নেই
বাংলাদেশ পলিপ্রপাইলিন প্লাস্টিক রোল অ্যান্ড প্যাকেজিং এসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশে পলিথিন উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশ থেকে প্লাস্টিকের দানা ও পাউডার এনে প্রতিদিন অসংখ্য ছোট-বড় বিভিন্ন আকারের ব্যাগ তৈরি হচ্ছে। তা সকল আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিপণন ও ব্যবহার হচ্ছে।
২০০২ সালে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের মারাত্মক ক্ষতিকারক দিক বিবেচনা করে রপ্তানিমুখী শিল্প ছাড়া সকল ধরনের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনকারী শিল্পের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এ আইন অনুযায়ী, পরিবেশ আইন অমান্য করলে দশ বছরের সশ্রম কারাদ- ও দশ লাখ টাকা জরিমানা করার বিধান রয়েছে। অন্যদিকে বাজারজাত করলে ৬ মাসের জেল ও ১০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
আইন করার পর বেশ কিছু দিন জোরালো অভিযান ও আইনের কঠোর প্রয়োগ চলছিল কিন্তু পরবর্তীতে বাজারগুলোতে প্রকাশ্যে পলিথিন ব্যবহার শুরু হলেও আইনের কোন প্রয়োগ নেই। স্পেশাল ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে পরিবেশ আদালত আইন, ২০০০ অনুযায়ী মামলা দায়েরের উদ্দেশ্যে মেট্রোপলিটন এলাকায় অ্যাসিসট্যান্ট কমিশনার অব পুলিশ পর্যন্ত মেট্রোপলিটন বহির্ভূত এলাকায় সহকারী পুলিশ সুপার পর্যন্ত পুলিশ কর্মকর্তাগণকে ২০০২ সালের ৪ মে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে উক্ত আইনে সংজ্ঞায়িত পরিদর্শক এর ক্ষমতা প্রদান করা হয়। সর্বশেষ ২০১০ সালে পলিথিনের পরিবর্তে পাটজাত দ্রব্য ব্যাগ ব্যবহারে আইন পাস করা হয়। প্রতিটি মোড়কে পাটজাত ব্যাগ ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়। কিন্তু এ বিষয়ে উদ্যোগ না নেয়ায় তা আলোর মুখ দেখেনি। ফলে পলিথিন ব্যবহার অবাধে হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে পলিথিন বিরোধী অভিযান জোরদার করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। এছাড়াও একজন সচিবের নেতৃত্বে একটি এনফোর্সমেন্ট মনিটরিং কমিটি করা হয়েছিল। কিন্তু বিচার বিভাগ পৃথককরণের পর মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায়। সেই সুযোগে সর্বত্র আবারো পলিথিন শপিং ব্যাগের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়েছে। যদিও কিছু দিন বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যে ধারায় মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হচ্ছে বলেও জানা যায়। কিন্তু এটা শুধু কাগজে কলমে বাজার ঘাটে এর বাস্তব প্রতিফলন নেই।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে মতে, গত তিন বছরে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২৩৩ মেট্রিক টন পলিথিন জব্দ ও এক কোটি ৮৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। গত কয়েক বছরের মধ্যে ২০০৭-০৮ সালের ঢাকার পরিবেশ আদালতে পলিথিন আটক সংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন আছে মাত্র ১৫/১৬টি। পরিবেশ অধিদফতরের এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৩ সালে সারাদেশে ৪ দশমিক ৫ মিলিয়ন পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার হতো প্রতিদিন। ২০০০ সালে এর ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়ায় ৯ দশমিক ৩ মিলিয়নে।

পলিথিন সিন্ডিকেট
রাজধানীসহ দেশব্যাপী নিষিদ্ধ পলিথিনের কারখানা গড়ে উঠেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের একশ্রেণীরি তদারককারী অসাধু কর্মকর্তার সহযোগিতায় নিষিদ্ধ পলিথিনের সিন্ডিকেট গড়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে পলিথিন উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করার পরও কোনোভাবেই বন্ধ করা যাচ্ছে না এর উৎপাদান, বেচাকেনা ও ব্যবহার। সরকার প্রণীত আইনও মানছে না পলিব্যাগ উৎপাদন, বিক্রি ও ব্যবসায় জড়িতরা। মূলত ব্যাপক চাহিদার কারণে এই সিন্ডিকেটকে থামানো যাচ্ছে না।
সরকার ২০০২ সালে ১০০ মাইক্রোনের কম পুরত্বের পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করে একটি আইন প্রণয়ন করে। বিভিন্ন রকম খাদ্যদ্রব্য, ওষুধ, সিমেন্ট, সার শিল্পসহ মোট ১৪টি পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়। এসবের বাইরেও পলিথিন ব্যবহার চলছে দেদারছে। পরিবেশ অধিদফতরের ঢাকা বিভাগীয় পরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) সুকুমার বিশ্বাস জানান, মিরপুর, পুরনো ঢাকার লালবাগ অঞ্চলসহ ঢাকার আশপাশে অসংখ্য পলিথিন কারখানা গড়ে উঠেছে। তবে সঠিক সংখ্যা বলা কঠিন। তিনি আরো জানান, প্রতি সপ্তাহেই নিষিদ্ধ পলিথিন আটক ও কারখানার বিরুদ্ধে ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালাচ্ছে। পলিথিন উৎপাদন, আমদানি, বাজারজাত, মজুদ, বিক্রি, বিক্রির জন্য প্রদর্শন, বিতরণ, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে পরিবহন করলে জরিমানা সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা এবং অনাদরে ৬ মাসের কারাদ- প্রদানের বিধান রয়েছে আইনে। পলিথিনের কাঁচামাল আমদানির ব্যাপারে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা নানা কৌশলে কাঁচামাল আমদানি করেছে। এসব ব্যবসায়ীরি সঙ্গে অধিদফতর কর্মকর্তাদের একাধিকবার আলোচনা হয়েছে। তারপরও তারা অবৈধভাবে পলিথিন উৎপাদনের কাজ অব্যাহত রেখেছে বলে আমরা খবর পাচ্ছি। পরিবেশ অধিদফতরের কর্মকর্তারা আরো জানান, ঢাকার আশপাশে বর্তমানে কয়েকশ অবৈধ পলিথিন ব্যাগ তৈরির কারখানা রয়েছে। এছাড়া পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা, কেরানীগঞ্জ ও মিরপুর উৎপাদিত হচ্ছে পলিথিন ব্যাগ। শুধু হাটবাজার দোকান নয়, বিভিন্ন পণ্য মোড়কজাত কারণেও প্রয়োজন দেখা দিয়েছে পলিথিনের আইন করে নিষিদ্ধ করা হলেও লক্ষ্য করা যাচ্ছে আইনের আগের চেয়ে এখন পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন অনেক বেশি হচ্ছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় ও অধিদফতর মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে অভিযান চালালেও বন্ধ হচ্ছে না পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণে। মাছ বাজার, কাঁচাবাজার, শপিংমল থেকে করে শুরু করে সর্বত্র পলিথিন ব্যবহার এখন ওপেন ক্রিসেট। ভ্রাম্যমাণ ফল বিক্রেতারাও পলিথিন ব্যবহার করছে। বাংলাদেশ পলিপ্রোপাইল প্লাস্টিক রোল অ্যান্ড প্যাকেজিং অ্যাসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে শুধু রাজধানীর অভ্যন্তরে রয়েছে ১ হাজারের বেশি পলিথিন ব্যাগ উৎপাদনের ছোট-বড় অবৈধ কারখানা। এর মধ্যে ৭০০ কারখানা রয়েছে পুরান ঢাকার লালবাগ, কামরাঙ্গীরচর, চকবাজার, কোতোয়ালী, সূত্রাপুর, হাজারীবাগ থানা এলাকায়।
এছাড়াও মিরপুর, কারওয়ানবাজার, তেজগাঁও ও টঙ্গীতে রয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় কারখানা। ঢাকার বাইরের কারখানাগুলো চট্টগ্রামসহ উত্তরাঞ্চলেও রয়েছে বেশকিছু কারখানা। পুরান ঢাকার পলিথিন ও কারখানাগুলোর বেশিরভাগই গোপন স্থানে অবস্থিত। বাইরে থেকে দেখা কিংবা বোঝার উপায় নেই এই ঘরটি পলিথিন কারখানা। সবসময় কারখানাগুলোর সদর দরজা জানালাগুলো বাইরে থেকে বন্ধ থেকে। বাইরের গেট ঝুলিয়ে রাখা হয় বড় বড় তালা। মূলত ভেতরে চলছে পলিথিন উৎপাদনের কাজ। পুরানো ঢাকার লালবাগ থানার ইসলামবাগ এলাকাতে বেশ কয়েকটি পলিথিন তৈরি কারখানা পরিচালিত হচ্ছে প্রকাশ্যে। মূলত পুলিশ প্রশাসনকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য বাইরে থেকে বন্ধ করে তালা দিয়ে রাখা হয় কারখানাগুলো। ভেতরে চলছে নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন। পুলিশ প্রশাসন ওই এলাকা থেকে গত ৩ বছরে অন্তত ১৩টি কারখানা সিলগালা করলেও বন্ধ হয়নি পলিথিন ব্যাগের উৎপাদন। পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন ব্যবহার নিষিদ্ধ করে আইন করা হলেও কেউ তাতে কোনো প্রকার তোয়াক্কাই করছে না। চকবাজারের খুচরা ব্যবসায়ী আব্দুস সালাম জানান, কাগজের ঠোঙা বা নেট ব্যবহার করলে খরচ হয় অনেক বেশি। প্রতি পিস নেটের দাম ১ টাকা ২৫ পয়সা, যেখানে মাত্র ৬৫ টাকায় ১ পাউন্ড পলিথিন ব্যাগ কিনলে দ্বিগুণেরও বেশি লাভ হয়। হাতের নাগালে সহজেই পাওয়া যাচ্ছে পলিথিন ব্যাগ। এছাড়া রাজধানরি সর্বত্র ব্যবহারে চলছে পলিথিন ব্যাগের ব্যবহার।

মোবাইল কোর্টনামা
নিষিদ্ধ পলিথিন বন্ধে প্রশাসনের একের পর এক অভিযান চলছে। কিন্তু তারপরও এটা থামিয়ে রাখা যাচ্ছে না। পলিথিন বন্ধে র‌্যাব, বিস্ফোরক অধিদফতরের পরিবেশ অধিদপ্তর সক্রিয় রয়েছে। অভিযানও চালিয়েছে। এমনকি বন ও পরিবেশ উপমন্ত্রী আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব নিজে অভিযানে নেতৃত্ব দিয়েছেন কিন্তু তারপরও এটা বন্ধ করা যাচ্ছে না। ২০১৫ সালের ৪ জুলাই র‌্যাবের অভিযানে পুরান ঢাকার সোয়ারীঘাট এলাকায় মদিনা বিশাল প্লাস্টিক, শাজাহান সুপার কোয়ালিটি, জিনাত প্লাস্টিক কারখানা বন্ধ করে দেয়। এ সময় ২ ট্রাক পলিথিন উদ্ধার করা হয়। ৬ জুলাই বংশাল ও আরমানিটোলায় অভিযান চালিয়ে শিহাব প্রিন্টিং এন্ড প্রেস, মক্কা প্রিন্টিং এন্ড প্রেস এবং মীম প্রিন্টিং এন্ড প্রেস সিলগালা করে দেয়। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক ২ জুলাই অভিযান চালিয়ে ১৬টি পলিথিন উৎপাদন কারখানা বন্ধ করে দেয়। এ সময় ৪০ জন পলিথিন জব্দ করে। একই সেপ্টেম্বর মাসে পুরান ঢাকায় অভিযান চালিয়ে ৭টি কারখানা বন্ধ করা হয়। কিন্তু তারপরও নিষিদ্ধ পলিথিন উৎপাদন ও বিক্রি বন্ধ করা যাচ্ছে না।

সচেতনতামূলক প্রচার
পলিথিনের ক্ষতিকর দিক উল্লেখ করে পরিবেশের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকল এনজিও এবং সংগঠনসমূহ প্রচারাভিযান চালিয়ে আসছে। তারা বিভিন্ন স্কুলের গেটে অপেক্ষামান অভিভাবক ও অভিভাবকাদের মধ্যে লিফলেট, প্রচারপত্র বিতরণ করেছে। জনগণকে সচেতন করতে মানব বন্ধন, সভা সেমিনার করেছে পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন ও এনভায়রমেন্ট অ্যান্ড সোস্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন। তাদের প্রচারণায় পাটের ব্যাগের উপযোগিতা ও পলিথিনের নেতিবাচক দিক উঠে আসে। তাদের এই দাবির পক্ষে দৃঢ় অবস্থান নেয় পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়। সমর্থন করে পরিবেশ মন্ত্রণালয়। পলিথিন বন্ধ করে পাটের ব্যাগ ব্যহারের সরকারি নির্দেশনা আসে। কিন্তু তারপও এটা মানা হচ্ছে না। জানা গেছে, ব্যবসায়ীরাই পাটের ব্যাগ ব্যবহারে উদ্যোগী নয়। তারা পচনশীল পাটের ব্যাগের স্থলে প্লাস্টিকের ব্যাগ ব্যবহারে অভ্যস্ত। এ জায়গা থেকে বের হয়ে আসছে না। পলিথিন পরিহার করে পাটের ব্যাগ ব্যবহারে মহিলাদের মধ্যে অনীহা দেখা যায়। পলিথিনের ব্যাগে মহিলারা নিজেদের বেশি স্মার্ট মনে করে। নারীদের এ ধরনের অহীনা পলিথিন ব্যবসায়ীদের পক্ষে কাজ করছে।
পরিবেশ আইনে যা আছে
পলিথিন সম্পর্কিত বিষয়ে বাংলাদেশ পরিবেশ আইন ১৯৯৫ (২০০২ সালের ৯ নং আইন দ্বারা সংশোধিত) এর ৬ক ধারার প্রদত্ত ক্ষমতা বলে সরকার সকল বা যে কোন প্রকার পলিথিন শপিং ব্যাগ বা পলিইথাইলিন বা পলিপ্রপাইলিন তৈরি অন্য কোন সামগ্রী পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হলে, এরূপ সামগ্রী উপাদান, আমদানি, বাজারজাতকরণ, বিক্রয়, বিক্রয়ের জন্য প্রদর্শন, মজুদ, বিতরণ,বাণিজ্যিক উদ্দেশ্য ব্যবহারর সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ করেছে। অথচ এই আইন অমান্য করে পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, বন ও পরিবেশমন্ত্রী
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বিচার বিভাগ পৃথককরণের ফলে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বন্ধ হয়ে যায় । পরবর্তী সময়ের সরকার মোবাইল কোর্ট পরিচালনার অনুমতি দিয়ে কিছু আইনের তালিকা করে । সেই তালিকায় বাংলাদেশ পরিবেশ আইন ছিল না । ফলে দীর্ঘদিন পলিথিন শপিং ব্যাগ উপাদনকারী ও বাজারজাতকারীর বিরুদ্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা বন্ধ থাকে । মূলত তখন থেকেই আবারো পলিথিন শপিং ব্যাগের ব্যাপক ব্যবহার শুরু হয়। বর্তমান সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যে ধারায় মোবাইল কোর্ট পরিচালিত হয় ওই ধারাসহ আরো বেশ কিছু ধারা মোবাইল কোর্টের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার রোধে কাজ করছে সরকার। পলিথিন উৎপাদন বন্ধ করার লক্ষ্যে কিছু কাজ চলছে এট সম্পন্ন হলে পলিথিন উৎপাদন বন্ধ হবে।

আবু নাসের খান, চেয়ারম্যান, পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন
পলিথিনের স্তর নদীর তলদেশের পলি আটকিয়ে শুধু নদীর নাব্যতাই নষ্ট করছে না বরং মাছ ও জীববৈচিত্র ধ্বংস করে পানিতে স্বাভাবিক অক্সিজেনের পরিমাণ আশঙ্কাজনক হারে হ্রাস করছে। পলিথিন ব্যাগ জমির উপাদন ক্ষমতা কমিয়ে দিচ্ছে। ঢাকা শহরের পয়ঃনিষ্কাশনের ৮০ ভাগ ড্রেন পলিথিন ব্যাগ কর্তৃক জমাট বেধে আছে। যার দরুন সামান্য বৃষ্টি হলেই ঢাকা শহরে দেখা দেয় অসহনীয় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ড্রেনেজ সিস্টেমকে সর্বদাই অচল করে রাখে।
২০০২ সালে নিষিদ্ধ হওয়ার পর জোরালো অভিযান ও আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পলিথিনের ব্যবহার শুন্যের কোটায় নামিয়ে আনা সম্ভব হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ প্রায় দশ বছর পার হলেও আইন ভঙ্গ করে যারা পলিথিন উপাদনবিক্রয় ও ব্যবহার করছে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত তেমন কোন প্রক্রিয়া দেখা যাচ্ছে না। যথাযথ নজরদারি না থাকায় আবার সেই আগের মতই পলিথিন ব্যবহার করা হচ্ছে।

নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন ব্যাগ উপাদন ও বিপণনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সাথে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার সাথে আর্থিক লেনদেন রয়েছে। যার কারণে দীর্ঘ দশ বছরের অধিক সময় পার হলেও পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য রক্ষার স্বার্থে পলিথিন উপাদন ও বাজারজাতকরণের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে না।

আমির হোসেন আমু, শিল্পমন্ত্রী
আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে পরিবেশ অধিদফতর বাংলাদেশে পরিবেশ ধ্বংসের বেপরোয়া প্রবণতা বন্ধ করার প্রয়াস চালাচ্ছে। এতে শিল্প উদ্যোক্তাসহ সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে পরিবেশ আইন মেনে চলার সংস্কৃতি সৃষ্টি হচ্ছে। পরিবেশ অধিদফতর ইতিমধ্যেই দেশব্যাপী পলিথিনের উপাদন ও বিক্রয় বন্ধ করার জন্য সকল পর্যায়ে জোর তৎপরতা ও সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করছে। গত তিন বছরে নিষিদ্ধ ঘোষিত পলিথিন শপিং ব্যাগ বন্ধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করে ২৩৩ মেট্টিক টন পলিথিন জব্দ ও এক কোটি ৮৭ লাখ ১৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য বর্তমানে দেশে কতগুলো পলিথিন ব্যাগ উপাদনকারী শিল্প প্রতিষ্ঠান আছে ও এদের উপাদনের পরিমাণ কত তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যান সরকারের হাতে নেই। পরিবেশ অধিদফতরের এক পূর্ববর্তী পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ১৯৯৩ সালে সারাদেশে প্রতিদিন ৪.৫ মিলিয়ন পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার হতো। ২০০০ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৯.৩ মিলিয়নে। বর্তমানে সর্বনাশা এই পলিথিনের ব্যবহার বাড়ছে লাগামহীনভাবে।

অধ্যাপক হারুনার রশিদ, মৃত্তিকা পানি ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
পলিথিন অপচনশীল বলে দীর্ঘদিন প্রকৃতিতে অবিকৃত অবস্থায় থাকে। যা মাটিতে সূর্যলোক, পানি ও অন্যান্য উপাদান প্রবেশে বাধা সৃষ্টি করে। পাশাপাশি পলিথিন থেকে সৃষ্ট ব্যাকটেরিয়া ত্বকে বিভিন্ন ধরনের রোগের জন্ম দেয়। ডায়রিয়া আমাশয় ছড়াতে পারে। পলিথিনের ক্ষতিকর দিক অনেক। একারণে পলিথিন নিষিদ্ধের আইন কার্যকর করা জরুরী। পরিবেশকে দ্রুত রক্ষার জন্য আজই সারাদেশ থেকে পলিথিনের মূলোপাটন করা জরুরি। পলিথিনের স্থলে কাগজ ও চটের ব্যাগ, যা সহজেই মাটিতে মিশে যায়, সেগুলোর ব্যবহারের উপর জোর দিতে হবে। তাছাড়া এগুলো পচলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়।

চাল ব্যসায়ীদের বক্তব্য
কারওয়ান বাজারের চাল ব্যবসায়ী শেখ আতিয়ার রহমান বলেন, সরকার পলিথিন উৎপাদন, বিপণন বিক্রয় ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করলেও সরকারি কর্মকর্তারা এটা মানতে চায় না। তারা ঘুষের বিনিময়ে পলিথিন উৎপাদন ও ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়। ব্যবসায়রা পলিথিন ব্যবহার করে তার কারণ হচ্ছে এটা সাশ্রয়ী, সহজে বহনযোগ্য ও দাম কম। অর্থাৎ ব্যবসায়ীরা লাভের দিকটা বিবেচনা করতে গিয়ে পলিথিন ব্যবহার করে। পাটের ব্যাগ দাম বেশি ও ভারী বলে বিবেচিত। এর কালারটা ভালো নয়। পাটের ব্যাগ ফসকে চাল, ডাল, চিনি পরে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। বৃষ্টি লাগলে এটা ভারী হয়ে যায়। এসব বিবেচনায় ব্যবসায়ীরা পাটের ব্যাগ ব্যবহার করতে চায় না। পাটের ব্যাগের প্রচলন করতে চাইলে সরকারকে দৃঢ় পদক্ষেপ নিতে হবে। সরকারের ভেতরে ঘুষখোর, ধান্ধাবাজ থাকলে পাটের ব্যাগের প্রচলন করা কঠিন ব্যাপার। সরকার ঠিক থাকলে পলিথিন বন্ধ করা কোনো বিষয় নয়। উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here