ইউপি নির্বাচন বাতিল না হলে বর্জন বিএনপির!

0
230

ভোট ডাকাতির অভিযোগ এনে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন বাতিল এবং নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগ দাবি করেছে বিএনপি। গতকাল রবিবার দুপুরে দলের পক্ষ থেকে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়েছে। পরে রাতে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে এক বৈঠকে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া পরবর্তী ধাপের ইউপি নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ানোর নীতিগত সিদ্ধান্ত নেন। তবে ভোট বর্জনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আজ সোমবার জোটের শরিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে। গুলশানে বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত ওই ‘জরুরি’ বৈঠকে উপস্থিত থাকা দলের অন্যতম সাংগঠনিক সম্পাদক ফজলুল হক মিলন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আজকের (গতকাল) বৈঠকে মূলত চলমান ইউপি নির্বাচন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। দলের সিনিয়র নেতারা তাঁদের মতামত দিয়েছেন। আগামীকাল (আজ) জোটের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। পরে ভোট বর্জন করা হবে নাকি জোট ভোটে থাকবে তা সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জানানো হবে।’ বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্রে জানা যায়, প্রথম দুই ধাপের নির্বাচনে অংশ নিলেও মাঝপথে ইউপি নির্বাচন বর্জনের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। মূলত দুটি কারণে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব ইউপি নির্বাচনের পরের তিনটি ধাপ বর্জন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। প্রথম কারণটি হচ্ছে, নির্বাচনী মাঠে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের প্রার্থী-সমর্থকদের ত্রাস সৃষ্টি, কেন্দ্র দখল ও ভোট কারচুপি। দ্বিতীয়টি হলো, বিএনপির মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের নানামুখী ঝুঁকি এড়ানো। দলের অনেক নেতাই তৃতীয় দফার ভোটে না যাওয়ার পক্ষে। ক্ষমতাসীন দলের সহিংসতা ও হতাহতের ঘটনার কারণে পরবর্তী ধাপের নির্বাচনে থেকে বিএনপির কোনো লাভ নেই বলে মনে করেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান। গতকাল সকালে এক আলোচনা সভায় তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন। যদিও এরই মধ্যে তৃতীয় ধাপের নির্বাচনের জন্য প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে বিএনপি। বিএনপির চেয়ারপারসনের প্রেস উইংয়ের এক সদস্য জানান, রাত ৯টার দিকে গুলশানে দলীয় প্রধানের কার্যালয়ে বৈঠক শুরু হয়। চলে রাত সোয়া ১১টা পর্যন্ত। বৈঠকে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য, ভাইস চেয়ারম্যানসহ জ্যেষ্ঠ নেতারা অংশ নেন। তাঁরা হলেন দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হান্নান শাহ, ড. আবদুল মঈন খান, নজরুল ইসলাম খান, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সেলিমা রহমান, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব  হোসেন, মীর মোহাম্মদ নাসির, সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী প্রমুখ। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ নেতা বলেছেন, যেভাবে ইউপি নির্বাচন হচ্ছে তাতে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীকের মর্যাদা নষ্ট হচ্ছে। জনপ্রিয় এই প্রতীককে অপমান করা যায় না। এটা স্পষ্ট হয়ে গেছে যে এ সরকার ও তাদের আজ্ঞাবহ নির্বাচন কমিশনের অধীনে কোনো পর্যায়ের নির্বাচন সুষ্ঠু হবে না। এ ব্যাপারে এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত। দলীয় প্রধানকেই তাঁরা চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে অনুরোধ করেন। দলের এক ভাইস চেয়ারম্যান সরাসরি ভোট বর্জনের পরামর্শ দিয়ে বৈঠকে বলেন, ‘দুটি কারণে আমাদের এই ভোট বর্জনের ঘোষণা দেওয়া উচিত।’ বৈঠকে উপস্থিত বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, ভাইস চেয়ারম্যান হাফিজ উদ্দীন আহমদ,  চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু, এ জে এম জাহিদ হোসেনসহ অনেকে নির্বাচনে থাকার পক্ষে। তাঁদের যুক্তি হচ্ছে, সরকারি দল নির্যাতন-হামলা-মামলা চালাবে। এটা জেনেই বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিয়েছে। এটা জেনেই নির্বাচনে টিকে থাকতে হবে। আর ভাইস চেয়ারম্যান শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, উপদেষ্টা জয়নুল আবেদীনসহ বেশ কয়েকজনের যুক্তি, এভাবে দলীয় প্রতীকের অপমান, নেতাকর্মীদের আর বিপদে না ফেলে নির্বাচন বর্জন হবে সঠিক সিদ্ধান্ত। তবে দলটির বেশ কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন, যেহেতু তৃতীয় দফা ইউপি নির্বাচনে বিএনপিসহ ২০ দলীয় জোটের প্রার্থী মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত, তাই এ দফায় তারা নির্বাচনে থেকে যেতে পারে। পরবর্তী তিন ধাপের বিষয়ে সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার জন্য আজ সোমবার বিএনপিপ্রধান খালেদা জিয়া জোট নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। রাত ৮টায় বিএনপি চেয়ারপারসনের কার্যালয়ে এই বৈঠক হবে বলে নিশ্চিত করেছেন কল্যাণ পার্টির মহাসচিব এম এম আমিনুর রহমান। এর আগে দুপুরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির নবনিযুক্ত সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী বলেন, ‘আজ্ঞাবাহী বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে সব নির্বাচন জনগণ ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। আমি বিএনপির পক্ষ থেকে অবিলম্বে ভোট ডাকাতির নির্বাচন বাতিলের দাবি জানিয়ে আবারও নির্বাচন কমিশনারদের পদত্যাগ দাবি করছি।’ নির্বাচন কমিশনের সমালোচনা করে বিএনপির এই নেতা বলেন, ‘শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দল নয়, দেশের সুশীল সমাজও এই নির্বাচন কমিশনারদের সরে যেতে বলেছে। কিন্তু তারা তাদের লজ্জার ভূষণ জাদুঘরে জমা দিয়ে দিয়েছেন।’ এদিকে বিএনপি হারের লজ্জা ঢাকতে ভোট বর্জন করতে যাচ্ছে বলে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ যে মন্তব্য করেছেন তার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে রিজভী দুই দফা ভোটে সহিংসতার আলোকচিত্র সাংবাদিকদের সামনে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘যারা মানুষের লাশের পাহাড় ডিঙিয়ে অবৈধ ক্ষমতাকে ধরে রাখতে চায়—তারা সহিংস রক্তপাত আর হত্যা নিয়ে নিষ্ঠুর রসিকতা করতেই পারে।’ গতকাল সকালে রাজধানীর পল্টনে ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনে বাংলাদেশ কল্যাণ পার্টি আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে বিএনপি নেতা নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘এই অনাচার, এই ভোট কারচুপি এবং লুট—এর মধ্যে যুক্ত থেকে লাভ কী?’

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here