সহজেই চুলপড়া বা টাক হওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারেন যেভাবে

0
892

আমাদের সৌন্দর্যের অত্যাবশকীয় উপাদান চুল। ঘন, উজ্জ্বল চুলের ঝলক সবার মাঝে নিজেকে করে তুলবে আরো আকর্ষণীয়। আর তাই আমরা চারপাশে দেখতে পাই রংবাহরি চুলও তার নিত্যনতুন ফ্যাশন। তবে সবার মাঝেই এক আতঙ্ক বিরাজ করে যার নাম চুলপড়া। ঘনচুল পড়ে পাতলা হয়ে যাওয়া বা অকালে টাক হওয়া বর্তমানের খুবই পরিচিত একটি সমস্যা। আর এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য শাত চেষ্টা করতেও অধৈর‌্য হয়না ফ্যাশন সচেতন মানুষেরা। চুল পড়ার প্রকৃত কারণ, এর প্রতিরোধ ও প্রতিকার সম্পর্কে সঠিক ধারণা থাকলে আমরা সহজেই চুলপড়া বা টাক হওয়ার হাত থেকে নিজেকে রক্ষা করতে পারি।

চুল পড়া ও পনুরায় গজানো মানবদেহের স্বাভাবিক একটি প্রকৃয়া। তবে এই চুল পড়ার মাত্রা যদি অস্বাভবিক হয় তাহলেই তা একটি সমস্যায় পরিণত হয়। চুল পড়ার হার যখন চুল গজানোর হারকে অতিক্রম করে তখনই চুল পাতলা হতে শুরু করে। দিনে ১০০টা চুল পড়লে তা স্বাভাবিক, এর বেশি চুল পড়লে তাকে অস্বাভাবিক মাত্রা বলা যায়।

মাথার স্কালফের প্রয়োজনীয় পুষ্টউপাদান না থাকা এবং চুলের গোড়ায় ময়লা জমার কারণে অনেক রকম ইনফেকশন ও খুশকি সৃষ্টি হয়। যার ফলে চুলের গোড়া দুর্বল হয়ে চুল পড়ে। এছাড়া বিভিন্ন রোগ, ওষুধের ব্যবহার, খাদ্যের ভিন্নতা এবং জিনগত বা বংশগতকারণে সাধারণত চুল পড়ে। চুল পড়ার বিভিন্নকারণগুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • শতকরা ৯৫ ভাগ চুল পড়ার কারণ জিনগত/ বংশগত । এ কারণে প্রাপ্তবয়স্ক ছেলেদের মাথার মাঝখানের ও কপালের দুই পাশের এবং মেয়েদের মাথার উপরিভাগের ও দু’পাশের চুল পাতলা হয়ে যায়।
  • খুস্কি চুলের গোড়া দুর্বল করে ফলে চুল পড়ে। এছাড়া ব্যাকটেরিয়া বা ছত্রাক জনিত ইনফেকশনের কারণে চুল পড়তে পারে।
  • রক্তস্বল্পতা, যেমনঃ আয়রনের অভাবজনিত রক্তস্বল্পতা চুল পড়ার কারণ । আয়রনের অভাবে আমাদের দেহে লোহিত রক্ত কণিকার সংখ্যা কমে যায়, যা আমাদের চুলের গোড়ার (হেয়ার ফলিকল) জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।
  • বিভিন্ন প্রকার উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন ঔষধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াতেও চুল পড়তে পারে।
  • মাত্রা অতিরিক্ত শ্যাম্পু করা, ঘন ঘন রঙ করা ও নিন্মমানের রং ব্যবহার করার ফলে চুল পড়ে।
  • থাইরয়েড হরমোনজনিত বা লিভারের সমস্যাজনিত কারণেও চুল পড়তে পারে।
  • কেমোথেরাপি নিলে চুল পড়ে যায়। এছাড়া অতিরিক্ত ডায়েট ফলে শরীরে পুষ্টি উপাদান কমে গেলে চুল পড়তে পারে।
  • মহিলাদের মেনোপজ হলে অর্থাৎ মাসিক বন্ধ হয়ে গেলে চুল পড়ে।
  • চুল পড়ার অন্যতম কারণ মানসিক চাপ।
  • প্রসাধনি হিসেবে কেমিক্যাল ব্যবহারেও চুল পড়ে।
  • পরিবারের কারো রিউমাটয়েড আথ্রাটিস, হাপানি, প্যারনেসিয়াস অ্যানিমিয়া ইত্যাদি রোগ থাকলে সেই পরিবারের লোকজনের চুল পড়া রোগও হতে পারে।
  • রাসায়নিক পদার্থযুক্ত হেয়ার জেল, হেয়ার ক্রিমের অতিরিক্ত ব্যবহার চুল পড়ার কারণ হতে পরে।
  • বিভিন্ন রকমের রোগ যেমনঃ ডায়াবেটিস, অটোইমিউন রোগ যেমন- লুপাস, মূত্রনালীর প্রদাহ, পলিসিস্‌টিক ওভারিয়ান সিনড্রোম ইত্যাদি চুল পড়ার কারণ।
  • নানা ধরনের ওষুধ যেমনঃ জন্মনিয়ন্ত্রিন পিল, এনটি ডিপ্রেসেন্ট, বিটা ব্লকার, কিছু এনএসএআইডি, ইমিউনো সাপ্রেসিভ এজেন্টস ইত্যাদি সেবন করলে এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া হিসেবে চুল পড়ে যেতে পারে।
  • চুল পড়ার জন্য চুলের গোড়ার বা ফলিকলে একটি এনজাইম তৈরি হয়, যার নাম ফাইভ আলফা রিডাকটেজ। এই এনজাইম রক্তে বাহিত হরমোন টেস্টেস্টেরনকে ডাই হাইড্রোটেস্টস্টেরনে পরিণত করে। যার আরেক নাম ডিএইচটি। ডিএইচটি চুলের গোড়ায় আক্রমণ চালায় এবং চুল দুর্বল করে ঝরে পড়তে সাহায্য করে।
  • প্রয়োজন মতো না ঘুমালে কিন্তু মাথায় চুল খুঁজে নাও পেতে পারেন।
  • গর্ভাবস্থায় চুল পড়তে পারে।
  • ভিটামিন ই এর অভাবে চুল পড়তে পারে।
  • ধূমপানের ফলে চুল পরে।এর কারনে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয়, রক্ত নালিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয় । এর কারনে চুল পড়া বেড়ে যায় এবং চুল বাদামি বর্ণ ধারন করে ।

যেখানে সমস্যা সেখানের রয়েছে তার সমাধান। আর চুল পড়া রোধের রয়েছে বিভিন্ন উপায়। এসব উপায় আপনার চুল পড়া শুধু বন্ধই নয় নতুন চুল গজাতেও সাহায্য করবে। চুল পড়া রোধের পায়গুলো নিচে উল্লেখ করা হলো:

  • প্রতি একদিন অন্তর শ্যাম্পু দিয়ে চুল পরিস্কার করুন। এটি আপনার চুলের গোড়ায় জমে থাকা ময়লা ও তৈলাক্ত পদার্থ দূর করে গোড়া শক্ত করতে সাহায্য করবে।
  • ভিটামিন-ই চুল পড়া রোধে ও নতুন চুল গজানোর ক্ষেত্রে খুবই কার্যকরী। তাই ভিটামিন ই সমৃদ্ধ কাবার গ্রহন করুন।
  • প্রতিদিনের খাদ্য তালিকায় পরিমাণমত শাকসবজি ও ফল যথেষ্ট পরিমাণে খাওয়া প্রয়োজন। অর্থাৎ ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করা প্রয়োজন। এছাড়া অতিরিক্ত ডায়েট কন্ট্রোল করা ঠিক না। এতে দেহের পুষ্টি উপাদানের ব্যালেন্স নষ্ট হয়।
  • ধূমপান ত্যাগ করুন।এর কারনে রক্ত চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় , রক্ত নালিকাগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয় । ফলে চুল পড়া বেড়ে যায় এবং চুল বাদামি বর্ণ ধারন করে ।
  • প্রচুর পরিমাণে লাল শাক, কচুশাক খেতে পারেন কারণ এগুলোতে রয়েছে প্রচুর আয়রন যা চুল পড়া কমাবে অনেকটা।
  • প্রটিন যুক্ত খাবার খান কারণ এটি শুধু যে চুল শক্ত করে তা নয়, চুল গজাতেও সহায়তা করে।
  • অতিরিক্ত চিনি ও চর্বিযুক্ত খাবারও পরিহার করুন।
  • সপ্তাহে অন্তত একদিন চুলের গোড়ায় ম্যাসেজ করুন। এতে স্কালফের রক্তসঞ্চালন বৃদ্ধি পায়। নুতন চুল গজাতে সাহায্য করে।
  • পর্যাপ্ত ঘুমান এবং বিশ্রাম নিন, কেননা ঘুম ও বিশ্রাম নতুন চুল গজানো ও বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়তা করে।

উপরোক্ত বিষয়গুলো অনুসরণ করলে আপনার চুল পড়ার মাত্রা আনেকাংশে কমবে এবং নতুন চুল গজাতে সাহায্য করবে। এছাড়া বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। আমাদের দেশের চিকিৎসা বিজ্ঞানও এ বিষয়ে বেশ উন্নতি লাভ করেছে। চালূ হয়েছে হেয়ার রিগ্রোথ ও হেয়ার ট্রান্সপ্ল্যান্টের মতো আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা যা আপনার টাক সমস্যাকে অতি সহজেই দুর করতে সক্ষম। এসব চিকিৎসা চুলপড়া রোধ, নুতন চুল গজানো ও টাক মাথায় চুল প্রতিস্থাপনের বেশ সফল। আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থাসম্পন্ন এসব চিকিৎসা সেবাকেন্দ্রে দিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ গ্রহণ করতে পারেন। হেয়ার ট্রিটমেন্টের উন্নত চিকিৎসা সেবা কেন্দ্রগুলোর মধ্যে বেশ পরিচিতি একটি প্রতিষ্ঠান হচ্ছে লেজার মেডিক্যাল সেন্টার। এছাড়া আপনার সুবিধা মতো যেকোন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিষ্ঠানে গিয়ে চুল পড়া সমস্যা দুর করতে পারেন। তবে একটি কথা না বললেই নয়, ভূয়া চিকিৎসালয়ের ভুল চিকিৎসা থেকে সতর্ক থাকবেন। বাজারে এমন অনেক পন্য রয়েছে যেগুলো গ্রাহকদের মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে ঠকাচ্ছে। এসব তেল বা লোশন ব্যবহার করে অনেকেই তাদের অবশিষ্ট চুলটুকুও হারিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

তাই সতর্কতার সাথে সঠিক চিকিৎসা ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। ভিটামিন ও মিনারেল সমৃদ্ধ খাদ্য খাওয়ার অভ্যাস তৈরি করুন। চুল পড়ার কারণ, এর প্রতিকার-প্রতিরোধ সম্পর্কে জানুন। নিশ্চিত করুন আপনার চুলের সুস্বাস্থ্য, নিজেকে করুন আরো সুন্দর্যমন্ডিত।

 

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here