অশ্রুভেজা রাজলক্ষ্মী

0
232

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে কয়েক শ গজ এগোলেই বাস হেলপারের হাঁকডাক শুরু হয়- রাজলক্ষ্মী। তবে এটা কোনো এলাকা বা নির্দিষ্ট স্থানের নাম নয়। ঢাকা-ময়মনসিংহ সড়কের পশ্চিম পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একটি বহুতল বিপণিবিতানের নাম। স্থানীয়ভাবে বলা হয় ‘রাজলক্ষ্মী মার্কেট’।

উত্তরা মডেল টাউনের ৩ নম্বর সেক্টরের ঠিক সম্মুখ অংশে ১৮ কাঠার একটি প্লটের ওপর দাঁড়িয়ে বিপণিবিতানটি। লোকমুখে দিনে দিনে পুরো এলাকাটিই রাজলক্ষ্মী নামে পরিচিতি পেয়েছে। উত্তরার সর্বপ্রথম আধুনিক বিপণিবিতান হওয়ায় এটি আলাদা একটি মাত্রা পেয়েছে। সেই মাত্রায় আরো ব্যাপকতা এনেছে এর প্রতিষ্ঠাতা নায়করাজ রাজ্জাকের নামটি।

নায়করাজ গত ২১ আগস্ট সন্ধ্যায় মারা যাওয়ার পরদিন তাঁর সম্মানে বিপণিবিতানটি বন্ধ রাখা হয়। সেদিন বিপণিবিতানের গেটে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলেন ষাটোর্ধ্ব ইসহাক। ৩৯ বছর ধরে তিনি এখানে আছেন।

চোখ মুছতে মুছতে বললেন, ‘১৯৮৮ সালের দিকে ঝালকাঠির রাজাপুর থেকে ঢাকায় এসে উদ্বাস্তুর মতো রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতাম। কোনো কাজ পাচ্ছিলাম না। একদিন রাজ্জাক স্যারের সামনে পড়ে যাই। তিনি আমার জীবনকাহিনি শুনে বললেন, ‘আমিও কলকাতা থেকে আপনার মতো উদ্বাস্তু জীবন নিয়ে ঢাকায় এসেছিলাম। এটা কোনো বিষয় নয়। আপনি উত্তরায় আমার প্লট দেখাশোনা করবেন। ‘ সেই থেকেই আমি স্যারের প্লট ও সেই প্লটের ওপর নির্মিত মার্কেটে চাকরি করছি। ‘

স্মৃতিচারণা করে ইসহাক বলেন, ‘রাজলক্ষ্মীর কাজ শুরুর প্রথম দিকে উত্তরা ছিল জনমানবশূন্য এলাকা। তখন রাজ্জাক স্যার প্রায় প্রতিদিন নির্মাণকাজ দেখতে আসতেন। কখনো তেজগাঁওয়ে এফডিসি থেকে আবার কখনো আউটডোর থেকে সরাসরি চলে আসতেন। এই মার্কেটের প্রতি স্যারের আলাদা একটা দরদ ছিল। তিনি নিজ সন্তানের মতোই রাজলক্ষ্মী গড়ে তুলেছিলেন। মার্কেটের দোকানপাট বিক্রি করলেও কখনো এর স্বত্ব হাতছাড়া করেননি। তাই এখনো তিনি স্বত্বাধিকারী হিসেবে জমিদারি ভাড়া পাচ্ছেন। ‘

রাজলক্ষ্মী মার্কেট অফিসে কাজ করেন আবদুল খালেক। তিনি ২৯ বছর ধরে এখানে আছেন। বললেন, ‘স্যার পাঁচ বছর ধরে মার্কেটে নিয়মিত আসেননি। অথচ আগে তিনি একদিন এখানে না এলে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারতেন না। মার্কেটটি ছিল স্যারের দ্বিতীয় বাড়ি। বর্তমানে তাঁর বড় ছেলে বাপ্পা স্যার জমিদারির আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশ করেন। ‘

আবদুল খালেক বলেন, ‘আমরা যারা ছোটখাটো চাকরি করি স্যার তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক সব খোঁজখবর নিতেন। কার কী অসুবিধা, কার বেতন বাড়ানো দরকার- সবকিছু তিনি তদারক করতেন। এত বড় একজন মানুষ হয়েও তিনি গরিব কর্মচারীদের প্রতি দরদি ছিলেন। তা না হলে এত দিন এখানে কাজ করতে পারতাম না। ‘

রাজলক্ষ্মীর প্রথম ব্যবস্থাপক সন্তোষ চন্দ্র দাস বলেন, ‘রাজ্জাক স্যার তাঁর অভিনয়জীবনে আয়ের বেশির ভাগ অর্থই এই মার্কেটের পেছনে ব্যয় করেছেন। নিজে অনেক কষ্ট করেছেন। সারা দিন শুটিং করে এসে মার্কেটে সময় দিতেন। অনেক সময় রুটি-বিস্কুট খেয়ে সময় কাটিয়ে দিতেন। তখন উত্তরায় দোকানপাট কিংবা হোটেল-রেস্তোরাঁ তো দূরের কথা, কোনো বাড়িঘরও গড়ে ওঠেনি। তিনি নিজের ঘামে মার্কেটটি নির্মাণ করে এর নাম রেখেছিলেন রাজলক্ষী কমপ্লেক্স। নিচে মার্কেট এবং ওপরে অফিসের উপযোগী হিসেবে ভবন নির্মাণ করা হয়। রূপায়ণ নামে একটি প্রতিষ্ঠানের মালিক আবদুল লতিফ এবং মুখলেছুর রহমান নামে দুজন ঠিকাদার এটা নির্মাণ করেছিলেন। ‘

সন্তোষ চন্দ্র জানান, রাজলক্ষ্মী কমপ্লেক্সের কাজ শুরু হয়েছিল ১৯৮৮ সালের মার্চে। শেষ হয় ১৯৯২ সালের দিকে। প্রথমে কমপ্লেক্সের তিন তলা পর্যন্ত নির্মাণ করা হয়। এরপর সোনালী ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে ছয় তলার কাজ শেষ করা হয়। তিল তিল করে গড়ে তোলা এই সম্পত্তির প্রতি রাজ্জাক স্যারের আলাদা একটি মায়া ছিল। অনেক সময় তিনি লুঙ্গি পরেই মার্কেটে চলে আসতেন। মার্কেটের ছয় তলায় একটি অফিস কক্ষ বানিয়েছিলেন। মার্কেটে এলে সেখানেই বসতেন।

সরেজমিনে গিয়ে রাজলক্ষ্মীর সর্বত্র শোকের ছায়া চোখে পড়েছে। বর্তমান ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘স্যার মার্কেটের কর্মচারীদের নিজ সন্তানের মতো দেখতেন। ব্যবসায়ীদের মনে করতেন পারিবারিক সদস্য। তাঁর মৃত্যুতে যেন আমরা আমাদের বাবাকেই হারিয়ে ফেলেছি। ‘

নজরুল ইসলাম জানান, নায়করাজ গুলশানের আজাদ মসজিদে নিয়মিত নামাজ আদায় করতেন। এক ওয়াক্ত নামাজও কাজা পড়তেন না। যেদিন তিনি মারা যান সেদিনও ফজর ও জোহরের নামাজ তিনি আজাদ মসজিদে গিয়ে আদায় করেন।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here