বসন্ত বাতাসে ফাগুন যে এসেছে ধরায় !

0
25

তিমির চক্রবর্ত্তী:
ফাগুন যে এসেছে ধরায় ! দক্ষিণা সমীরণ, কোকিলের কুহুতান, শিমুল, পলাশ আর পিয়ালের হাসিতে বসন্ত সেজেছে তার অপরূপ সাজে। বাংলার শ্যামল প্রান্তে দিক-দিগন্তে, বন-বনান্তে ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী রূপে ফাগুন আজ জাগ্রত দ্বারে। মঞ্জুরিত নব পুস্প সৌরভে, দক্ষিণা সমীরনে আর কোকিলের কুহুতানে মানব মনে মাদকতার ছোঁয়া জাগাতে এসেছে বসন্ত। অশোক, পলাশ, শিমুল, পিয়ালের মন মাতানো দিন সমাগত আবার। পত্র পল্লবের বৃক্ষচ্ছায়ে নদীতটে সর্বত্রই আশ্চার্য শিহরণ জাগিয়ে তোলার ঋতু এই বসন্ত। পথে প্রান্তরে বিকশিত হবে কাঞ্চন ফুল, ডালে ডালে আ¤্র মুকুল উঠেছে হেসে প্রকৃতিতে তাই আজ সাজ সাজ রব। শীতের হীমেল পরশে প্রকৃতি যে জরাগ্রস্ত বিবর্ন রূপ ধারন করেছিল আজ আজ বসন্তের প্রথম দিনে এখন জেগে উঠেছে নবীন জীবনের ঢেউ। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন “ফাল্গুনে আতপ্ত দক্ষিণে হাওয়া ছড়িয়ে দিয়েছে বিরহ, মিলনের স্বগত প্রলাপ আ¤্র মুকুলের গন্ধে/ বনের মর্মর ধ্বনি বাতাসের স্পধায় ধৈর্য্য হারিয়েছে অকস্মাৎ কল্লোলোচ্ছাসে।” কম্পিত কিশলয়ে দক্ষিনা সমীরনের শিহরন জাগানোর দিন এখন। এ দক্ষিন হাওয়া আলতো পরশ একেঁ দেবে অরন্যে-পর্বতে, পত্র-পল্লবে, ঘাসে-ঘাসে, নদী তটে ও বৃক্ষশাখে। নব যৌবনের বান ডেকে যাবে মানব-মানবীর হৃদয়ে । জারুল, পারুল, মাধবী, মালতী, রজনীগন্ধা, পলাশ, জবা, কনকচাঁপার গুচ্ছ আন্দোলিত হবে নব জীবনের স্পন্দনে। বসন্ত বাতাসে হিল্লোলিত হয়ে আছে আ¤্রকুঞ্জ, নব পত্রে ও পুস্পে ঢাকা বন-বিথিকা উঠেছে কেঁপে। তাই কবির ভাষায় বলতে হয় ‘আমারে কে নিবি ভাই সঁপিতে চাই আপনারে’- প্রাণের এই আকুতি যেন ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হবে আকাশে বাতাসে। মানুষের মন ময়ূরী উঠবে নেচে। তরু রাজির প্রাণে প্রাণে কি কথা যেন হবে মর্মরিত, ভ্রমর উঠবে গুঞ্জরিয়া। সমস্ত দ্যুলোক- ভ’্যলোক মিলে তরুন তরুনীর প্রাণে দেবে মন্ত্রনা। অশোকে- অশত্থে, শিরিষে, শাল পিয়ালে লেগেছে হাওয়ার নাচন। পলাশ, মাধবী শিমুলের ডালে ডালে ফুটেছে রঙের বাহার। আর মধুরম মায়াবী আবেশে ঘিরে রইবে বৃক্ষলতা গুল্ম, পশু পাখি ও মানুষকে। বসন্ত সুখের মতো এক ব্যথা জাগিয়ে দেয় মানব চিত্তে। নব নব পুস্প পল্লবে ছাওয়া প্রকৃতি এক অপার্থিব প্রেরনায় উদ্ভুদ্ধ করে মানব মনকে। নব যৌবনের রসে সিক্ত হয়ে ওঠে সে মন।
কি যেন পাবার, কি যেন দেখবার, কি যেন প্রাণে-মনে চোখে পুরে নেয়ার এক অব্যক্ত আকুতিতে পাগলপারা হয়ে ওঠে হৃদয়। প্রকৃতিতে নবীন জীবনের ও নব যৌবনের উদ্বেলতা সুরে-ছন্দে, তালে-লয়ে, বর্ণে-গন্ধে ত্রি ফেনিল উচ্ছাস বয়ে আনে। এক চির চেনা কিন্তু অজানা অসীম রহস্যে ঘেরা অনির্বচনীয় রূপচ্ছটায় হৃদয়ের সিংহদুয়ার যায় খুলে। উতলা আর উদাস করা ঝিরি ঝিরি হাওয়া আর প্রকৃতির সতেজ শ্যামল বর্নিল রূপ মাধুরী মানুষকে পরানের সাথে মরন খেলা মেতে উঠার প্রেরনা দেয়। মনের গভীরে এই অস্ফুট আর্তি ধ্বনিত হয়। জনম অবধি হম রূপ নেহারলু নয়ন না তিরপিত ভেল। সুখ-দু:খ জাগানিয়া বসন্তের অপরূপ সাজ-সজ্জায় সৃষ্টির বৈচিত্রময়তা আর দুর্ভেয় রহস্য থাকে লুকিয়ে। তাই দু:খের মাঝেও মানব চিত্তে তা আনন্দের বিমোক্ষন ঘটায়। মনে যেন কেবলই বলে ওঠে ‘রুক্ষ দিনের দু:খ পাইতো পাবো, শান্তনা নাহি শান্তনা নাহি চাব।’ বসন্তের আগমনে মানব মন পুলকিত আর আন্দোলিত হয় বলেই কবিরা আকাশে চোখ মেলে তাকাতেই যেন জ্বলে ওঠে আলো, প্রেমিক-প্রেমিকা এই বসন্ত আবেশেই বর্জ নিঘোষে ঘোষনা দেয়- ‘মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে জানিব তুমি আছ, আমি আছি।’ এই বসন্তের রোদেলা দুপুরে মন উদাস করা বিবাগী পবনে মায়া ভরা গোধুলী লগ্নে, বসন্তানিলের সিগ্ধ পরশে বা সোনা ঝরা পূর্নিমা নিশিথে অথবা নির্মেঘ আমাবশ্যা আচ্ছাদিত পুস্পিত কাননের সৌ প্রকৃতিতে আনন্দধারা বয়ে যায়। আকাশ বাতাস যৌবনের ঝড়ে আন্দোলিত হয়ে মনের রাগ রাগিনিটা আবীর রাঙা হয়ে ওঠে সুরেলা বাতাসের মৃদু-মন্দ চালে। তাই কবির ভাষায় আবারো বলতে হয়- ‘উত্তরী বায় মাঘীছে বিদায় হিম বিথিকার পাশে।’

 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here